উন্নততর জীবনধারা
Part-1: খাদ্য ও পুষ্টি — সম্পূর্ণ ইন্টারেক্টিভ ক্লাসনোট
পুষ্তি হলো পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যবস্তু আহরণ করে তা পরিপাক ও শোষণ করা এবং আত্তীকরণ দ্বারা দেহের শক্তির চাহিদা পূরণ, রোগ প্রতিরোধ, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করা। পুষ্টির ইংরেজি শব্দ হলো Nutrition।
খাদ্যের যেসব জৈব অথবা অজৈব উপাদান জীবের বেঁচে থাকার জন্য দরকারি শক্তির জোগান দেয়, তাদের একসঙ্গে পরিপোষক বা নিউট্রিয়েন্টস (Nutrients) বলে।
- খাদ্য দেহের গঠন, বৃদ্ধিসাধন, ক্ষয়পূরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
- খাদ্য দেহে তাপ উৎপাদন করে, কর্মশক্তি প্রদান করে।
- খাদ্য রোগ প্রতিরোধ করে, দেহকে সুস্থ, সবল এবং কর্মক্ষম রাখে।
খাদ্যের উপাদান ছয়টি: শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানি। এছাড়াও খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আঁশ।
চিত্র: খাদ্যের উপাদান
- শ্বেতসার বা স্টার্চ: ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য শস্য দানা স্টার্চের প্রধান উৎস। এছাড়া আলু, রাঙা আলু বা কচুতেও পাওয়া যায়।
- গ্লুকোজ: আঙুর, আপেল, গাজর, খেজুর ইত্যাদিতে পাওয়া যায়।
- ফ্রুক্টোজ (Fruit Sugar): আম, পেঁপে, কলা, কমলালেবু প্রভৃতি মিষ্টি ফল এবং ফুলের মধুতে থাকে।
- সুক্রোজ: আখের রস, চিনি, গুড়, মিছরির উৎস।
- সেলুলোজ: বেল, আম, কলা, তরমুজ, বাদাম, শুকনো ফল এবং সব ধরনের শাকসবজিতে থাকে।
- ল্যাকটোজ বা দুধ শর্করা: গরু, ছাগল এবং অন্যান্য প্রাণীর দুধে এই শর্করা থাকে।
- গ্লাইকোজেন: পশু ও পাখিজাতীয় প্রাণীর যকৃৎ এবং মাংসে (পেশিতে) গ্লাইকোজেন শর্করাটি থাকে।
- শর্করা শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং তাপশক্তি উৎপাদন করে।
- জীবদেহে বিপাকীয় (Metabolic) কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি কার্বোহাইড্রেট জারণের ফলে উৎপন্ন হয়।
- গ্লাইকোজেন প্রাণীদেহে খাদ্যঘাটতিতে বা অধিক পরিশ্রমের সময় শক্তি সরবরাহ করে।
- সেলুলোজ একটি অপাচ্য প্রকৃতির শর্করা, এটি আঁশযুক্ত খাদ্য। এটি আমাদের দৈনন্দিন মল ত্যাগে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।
- খাদ্যে প্রোটিন কিংবা ফ্যাটের অভাব হলে শর্করা থেকে এগুলো সংশ্লেষিত হতে পারে।
প্রাণীদেহের গঠনে প্রোটিন অপরিহার্য। দেহকোষের বেশির ভাগই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। দেহের হাড়, পেশি, লোম, পাখির পালক, নখ, পশুর শিং — এগুলো সবই প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়। প্রাণীদেহের শুষ্ক ওজনের প্রায় ৫০% হচ্ছে প্রোটিন।
- প্রাণিজ আমিষ: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত পদার্থ — সম্পূর্ণ প্রোটিন (সব অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে)।
- উদ্ভিজ্জ আমিষ: ডাল, সয়াবিন, মটরশুঁটি বীজ এবং ভুট্টার মধ্যে পুষ্টিমূল্য বেশি। তবে অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাদ্যে অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে না।
ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লিসারলের সমন্বয়ে স্নেহ পদার্থ গঠিত হয়। আমাদের খাবারে প্রায় ২০ ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।
| প্রকারভেদ | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| কঠিন স্নেহ (চর্বি) | সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন | মাছ বা মাংসের চর্বি |
| তরল স্নেহ (তেল) | অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় তরল | সয়াবিন, সরিষার তেল |
| প্রাণিজ স্নেহ | চর্বিসহ মাংস, মাখন, ঘি, পনির, ডিমের কুসুম | মাখন, ঘি, পনির |
| উদ্ভিজ্জ স্নেহ | বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিজ্জ তেল | সরিষা, সয়াবিন, তিল, ভুট্টা, নারকেল |
- খাদ্যবস্তুর মধ্যে স্নেহ পদার্থ সবচেয়ে বেশি তাপ এবং অন্যান্য প্রকার শক্তি উৎপন্ন করে।
- দেহের পুষ্টি এবং বৃদ্ধির জন্য স্নেহ পদার্থ অতি আবশ্যক।
- স্নেহ পদার্থ দেহ থেকে তাপের অপচয় বন্ধ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
- ত্বকের মসৃণতা এবং সজীবতা বজায় রাখে এবং চর্মরোগ প্রতিরোধ করে।
- যেসব ভিটামিন (A, D, E এবং K) স্নেহজাতীয় পদার্থে দ্রবণীয়, সেগুলো শোষণে সাহায্য করে।
ভিটামিন হচ্ছে জৈব প্রকৃতির যৌগিক পদার্থ। কেকটি ভিটামিন স্নেহজাতীয় পদার্থে দ্রবীভূত হয়, আবার কেকটি ভিটামিন পানিতে দ্রবীভূত হয়।
- স্নেহে দ্রবণীয়: ভিটামিন A, D, E ও K
- পানিতে দ্রবণীয়: ভিটামিন B কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন C
উৎস: ডিম, গরুর দুধ, মাখন, ছানা, দই, ঘি, যকৃৎ ও বিভিন্ন তেলসমৃদ্ধ মাছ (বিশেষ করে কড মাছ)। উদ্ভিজ্জ উৎসে ক্যারোটিন সমৃদ্ধ শাক-সবজি: লালশাক, কচুশাক, পুঁইশাক, পাটশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক, পুদিনা পাতা, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, আম, পাকা পেঁপে, কাঁঠাল।
- দেহের স্বাভাবিক গঠন এবং বর্ধন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার কাজ নিশ্চিত করে।
- ত্বক, চোখের কর্নিয়া ইত্যাদিকে স্বাভাবিক ও সজীব রাখে।
- হাড় এবং দাঁতের গঠন এবং দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখে।
- দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
- দেহে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
উৎস: একমাত্র প্রাণিজ উৎস থেকেই ভিটামিন D পাওয়া যায়। সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে মানুষের ত্বকে উপস্থিত কোলেস্টেরল থেকে ধাপে ধাপে লিভার ও কিডনির সহায়তায় সংশ্লেষিত হয়। ডিমের কুসুম, দুধ এবং মাখন ভিটামিন D-এর প্রধান উৎস।
অভাবজনিত রোগ: শিশুদের রিকেট রোগ। অতিরিক্ত গ্রহণে অধিক ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষিত হওয়ায় বৃক্ক, হৃৎপিণ্ড, ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমা হতে থাকে।
উৎস: সব রকম উদ্ভিজ্জ ভোজ্য তেল, বিশেষ করে পাম তেল ভিটামিন E-এর ভালো উৎস। শস্যদানার তেল (Corn oil), তুলা বীজের তেল, সূর্যমুখী বীজের তেল, লেটুস পাতাতেও পাওয়া যায়।
কাজ: মানুষের শরীরে ভিটামিন E হলো এন্টি-অক্সিডেন্ট, যেটি ধমনিতে চর্বি জমা রোধ করে এবং সুস্থ ত্বক বজায় রাখে।
পানিতে দ্রবণীয় ১২ প্রকার ভিটামিন B রয়েছে। দেহের বৃদ্ধি, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কাজ, দেহকোষে বিপাকীয় কাজ, প্রজনন ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য খাদ্যে ভিটামিন B কমপ্লেক্সের উপস্থিতি অতি আবশ্যক।
| ভিটামিন | উৎস | অভাবজনিত রোগ |
|---|---|---|
| থায়ামিন (B1) | ঢেঁকিছাঁটা চাল, আটা, ডাল, তেলবীজ, বাদাম, যকৃৎ, টাটকা ফল ও সবজি | বেরিবেরি রোগ, স্নায়ুর দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ |
| রাইবোফ্লাভিন (B2) | যকৃৎ, দুধ, ডিম, সবুজ শাকসবজি, গাছের কচি ডগা | ঠোঁটের দুপাশে ফাটল, মুখে ও জিভে ঘা, ত্বক খসখসে |
| নিয়াসিন (B5) | মাংস, যকৃৎ, আটা, ডাল, বাদাম, তেলবীজ, ছোলা, শাকসবজি | পেলেগ্রা রোগ (ত্বকে প্রদাহ, ডায়রিয়া, স্মৃতিভ্রংশ) |
| পাইরিডক্সিন (B6) | চাল, আটা, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ছোলা, ছত্রাক, বৃক্ক, ডিমের কুসুম | খাওয়ায় অরুচি, বমিভাব ও অ্যানিমিয়া |
| কোবালামিন (B12) | যকৃৎ, দুধ, মাছ, মাংস, ডিম, পনির, বৃক্ক প্রভৃতি | রক্তস্বল্পতা, স্নায়ুতন্ত্রের অবক্ষয় |
উৎস: টাটকা শাকসবজি এবং টাটকা ফলে ভিটামিন C পাওয়া যায়। শাক-সবজির মধ্যে মুলাশাক, লেটুস পাতা, ধনে পাতা, পুদিনা পাতা, কাঁচা মরিচ, ফুলকপি, করলা ইত্যাদিতে ভিটামিন C আছে। ফলের মধ্যে আমলকী, লেবু, কমলালেবু, টেমেটো, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি ভিটামিন C-এর উৎস।
- ক্যালসিয়াম: হাড় ও দাঁত গঠনে সহায়তা করে। উৎস: দুধ, ডিম, শাকসবজি।
- আয়রন (লোহা): রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজন। উৎস: মাংস, কলিজা, শাক।
- আয়োডিন: থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন তৈরিতে সহায়ক। উৎস: সামুদ্রিক মাছ, আয়োডিনযুক্ত লবণ।
- ফসফরাস: হাড় ও দাঁত গঠনে কাজ করে। উৎস: মাছ, মাংস, ডিম।
- সোডিয়াম: দেহের তরলের ভারসাম্য রক্ষা করে। উৎস: সাধারণ লবণ।
- দেহের প্রায় ৬০-৭০% পানি দিয়ে গঠিত।
- পানি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- পরিপাক ক্রিয়ায় এবং খাদ্য উপাদান শোষণে সহায়তা করে।
- বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থ মল, মূত্র ও ঘামের মাধ্যমে বের করে দেয়।
- জয়েন্টগুলোতে লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে।
- এটি পরিপাকে সহায়তা করে। রাফেজ পানি শোষণ করে এবং মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
- শরীর থেকে অপাচ্য খাদ্য নিষ্কাশনে সাহায্য করে।
- এটি শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করে।
- বারবার ক্ষুধার প্রবণতা কমাতে এটি কাজ করে।
- রাফেজযুক্ত খাদ্য গ্রহণে পিত্তথলির রোগ, খাদ্যনালি ও মলাশয়ের ক্যান্সার, অর্শ, হৃদরোগ ও স্থূলতার ঝুঁকি অনেকাংশে হাস করে।
প্রতিদিন ২০-৩০ গ্রাম আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।
দেহের উচ্চতার সাথে ওজনের সামঞ্জস্য রক্ষা করার সূচককে বিএমআই (BMI: Body Mass Index) বা ভরসূচি বলা হয়। মানবদেহের বৃদ্ধি ২০-২৪ বছর পর্যন্ত ঘটে এবং তারপর আর উচ্চতার বৃদ্ধি হয় না।
| BMI মান | অবস্থা | ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| < ১৮.৫ | কম ওজন (Underweight) | পুষ্টির অভাব থাকতে পারে |
| ১৮.৫ – ২৪.৯ | স্বাভাবিক (Normal) | সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ |
| ২৫ – ২৯.৯ | অতিরিক্ত ওজন (Overweight) | সতর্কতা প্রয়োজন |
| ≥ ৩০ | স্থূলকায় (Obese) | বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেশি |
যে খাদ্যে সাতটি উপাদানই গুণাগুণ অনুসারে উপযুক্ত পরিমাণে থাকে এবং যে খাদ্য গ্রহণ করলে দেহে স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ ক্যালরি ও আঁশ পাওয়া যায়, তাকে সুষম খাদ্য (বা ব্যালান্সড ডায়েট) বলে।
চিত্র: একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক সুষম খাদ্যের বিভাজন
- সুস্থ কর্মশীল পুরুষ — প্রতিদিন প্রায় ২৫০০ কিলোক্যালরি
- নারীর বেলায় — প্রতিদিন প্রায় ২০০০ কিলোক্যালরি
- ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং রাফেজ বা আঁশের জন্য শাকসবজি ও ফল খাওয়া প্রয়োজন।
| শর্করা | প্রোটিন | স্নেহজাতীয় পদার্থ | ভিটামিন | খনিজ লবণ |
|---|---|---|---|---|
| ভাত | মাছ | মাখন | দুধ, ডিম | দুধ |
| রুটি | মাংস | তেল | ফলমূল | ডিম |
| চিনি/গুড় | ডিম | ঘি | মাছ, মাংস | শাকসবজি |
| বৈশিষ্ট্য | শর্করা | আমিষ | স্নেহ পদার্থ | ভিটামিন |
|---|---|---|---|---|
| মৌলিক উপাদান | C, H, O | C, H, O, N (S, P) | C, H, O | জৈব যৌগ |
| প্রতি গ্রামে শক্তি | ৪ kcal | ৪ kcal | ৯ kcal | শক্তি দেয় না |
| প্রধান কাজ | শক্তি উৎপাদন | দেহ গঠন ও ক্ষয়পূরণ | শক্তি সঞ্চয় | বিপাক নিয়ন্ত্রণ |
| দেহে সঞ্চিত হয়? | হ্যাঁ (গ্লাইকোজেন) | সীমিত | হ্যাঁ (ফ্যাট সেলে) | কিছুটা (স্নেহে দ্রবণীয়) |
| প্রধান উদ্ভিজ্জ উৎস | চাল, গম, আলু, চিনি | ডাল, সয়াবিন, বাদাম | সরিষা, সয়াবিন তেল | শাকসবজি, ফলমূল |
| প্রধান প্রাণিজ উৎস | দুধ (ল্যাকটোজ), মাংস (গ্লাইকোজেন) | মাছ, মাংস, ডিম, দুধ | মাখন, ঘি, চর্বি | মাছ, মাংস, ডিম |
| অভাবজনিত সমস্যা | ক্লান্তি, দুর্বলতা, ওজন কমে | কোয়াশিওরকর, মেরেসমাস | দেহের ওজন কমে, ত্বক খসখসে | বিভিন্ন নির্দিষ্ট রোগ |
| অতিরিক্ত গ্রহণে সমস্যা | স্থূলতা, ডায়াবেটিস | কিডনিতে চাপ পড়ে | হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্থূলতা | টক্সিসিটি (A, D) |
| দ্রাব্যতা | পানিতে দ্রবণীয় | পানিতে আংশিক দ্রবণীয় | স্নেহে দ্রবণীয় | স্নেহে/পানিতে উভয়ে |
| দেহের মোট ওজনের % | প্রধান জ্বালানি | শুষ্ক ওজনের ৫০% | পরিবর্তনশীল | অতি সামান্য |
| পরিপাক পণ্য | গ্লুকোজ | অ্যামাইনো অ্যাসিড | ফ্যাটি অ্যাসিড + গ্লিসারল | পরিপাক ছাড়াই শোষিত |
রাতকানা হিসেবে দেখা দিলেও দীর্ঘস্থায়ী অভাবে চোখের কর্নিয়ায় আলসার হতে পারে এবং সম্পূর্ণ অন্ধত্ব হতে পারে। ত্বকের লোমকূপের গোড়ায় ছোট ছোট গুটির সৃষ্টি হতে পারে।
শিশুদের রিকেট রোগ হতে পারে — হাড় নরম হয়ে যায়, পা বাঁকা হয়। অধিক গ্রহণে বৃক্ক, হৃৎপিণ্ড, ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমা হয়।
দেহে থায়ামিনের চরম অভাবে বেরিবেরির লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর অভাবে স্নায়ুর দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি, খাওয়ায় অরুচি, ওজনহীনতা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
রাইবোফ্লাভিনের অভাবে ঠোঁটের দুপাশে ফাটল দেখা দেয়, মুখে ও জিভে ঘা হয়, ত্বক খসখসে হয়।
নিয়াসিনের অভাবে পেলেগ্রা রোগ হয়। পেলেগ্রা রোগের প্রধান উপসর্গ হলো ত্বকে প্রদাহ, ডায়রিয়া এবং স্মৃতিভ্রংশ হওয়া।
অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়। দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়, মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। ত্বকে রক্তক্ষরণ দেখা যায়।
দেহকোষের বেশির ভাগই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। প্রোটিনের অভাবে কোয়াশিওরকর (বয়স্কদের) ও মেরেসমাস (শিশুদের) রোগ হয়।
আয়রনের অভাবে হিমোগ্লোবিন কম হয়, ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এর লক্ষণ।
উপাদান:
- শর্করা (প্রধান শক্তির উৎস)
- আমিষ (দেহ গঠন ও ক্ষয়পূরণ)
- স্নেহ পদার্থ (শক্তি সঞ্চয়)
- ভিটামিন (বিপাক নিয়ন্ত্রণ)
- খনিজ লবণ (দেহের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ)
- পানি (দেহের তরল ভারসাম্য রক্ষা)
- আঁশ (পরিপাকে সহায়তা)
কাজ:
- দেহের স্বাভাবিক গঠন এবং বর্ধন নিশ্চিত করে।
- ত্বক, চোখের কর্নিয়া ইত্যাদিকে স্বাভাবিক ও সজীব রাখে।
- হাড় ও দাঁতের গঠন এবং দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখে।
- দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
- দেহে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
সূত্র: BMI = দেহের ওজন (কেজি) ÷ [দেহের উচ্চতা (মিটার)]²
BMI-এর মান অনুযায়ী শারীরিক অবস্থা:
- BMI < ১৮.৫ → কম ওজন (Underweight)
- BMI ১৮.৫ – ২৪.৯ → স্বাভাবিক (Normal)
- BMI ২৫ – ২৯.৯ → অতিরিক্ত ওজন (Overweight)
- BMI ≥ ৩০ → স্থূলকায় (Obese)
- উদ্ভিজ্জ উৎস: শ্বেতসার (স্টার্চ) — ধান, গম, ভুট্টা, আলু; গ্লুকোজ — আঙুর, আপেল, গাজর; ফ্রুক্টোজ — মিষ্টি ফল; সুক্রোজ — চিনি, গুড়; সেলুলোজ — শাকসবজি, ফলমূল।
- প্রাণিজ উৎস: ল্যাকটোজ (দুধ শর্করা) — গরু ও ছাগলের দুধ; গ্লাইকোজেন — পশু ও পাখির যকৃৎ ও মাংস।
- শর্করা শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং তাপশক্তি উৎপাদন করে (প্রতি গ্রামে ৪ kcal)।
- বিপাকীয় কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি কার্বোহাইড্রেট জারণের ফলে উৎপন্ন হয়।
- গ্লাইকোজেন খাদ্যঘাটতি বা অধিক পরিশ্রমের সময় শক্তি সরবরাহ করে।
- সেলুলোজ মল ত্যাগে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।
প্রকারভেদ:
- কঠিন স্নেহ (চর্বি): সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন। যেমন: মাছ বা মাংসের চর্বি।
- তরল স্নেহ (তেল): অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় তরল। যেমন: সয়াবিন, সরিষার তেল।
- খাদ্যবস্তুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাপ এবং অন্যান্য প্রকার শক্তি উৎপন্ন করে (প্রতি গ্রামে ৯ kcal)।
- দেহের পুষ্টি এবং বৃদ্ধির জন্য আবশ্যক।
- ভবিষ্যতের জন্য খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
- ত্বকের মসৃণতা ও সজীবতা বজায় রাখে এবং চর্মরোগ প্রতিরোধ করে।
- থায়ামিন (B1): উৎস — ঢেঁকিছাঁটা চাল, আটা, ডাল। অভাবে — বেরিবেরি, স্নায়ুর দুর্বলতা।
- রাইবোফ্লাভিন (B2): উৎস — যকৃৎ, দুধ, ডিম, সবুজ শাকসবজি। অভাবে — ঠোঁটের দুপাশে ফাটল, মুখে ও জিভে ঘা।
- নিয়াসিন (B5): উৎস — মাংস, যকৃৎ, আটা, ডাল। অভাবে — পেলেগ্রা (ত্বকে প্রদাহ, ডায়রিয়া, স্মৃতিভ্রংশ)।
- পাইরিডক্সিন (B6): উৎস — চাল, আটা, মাছ, মাংস। অভাবে — অ্যানিমিয়া, বমিভাব।
- কোবালামিন (B12): উৎস — যকৃৎ, দুধ, মাছ, মাংস। অভাবে — রক্তস্বল্পতা, স্নায়ুতন্ত্রের অবক্ষয়।
0 Comments