উন্নততর জীবনধারা | খাদ্য ও পুষ্টি | নবম-দশম শ্রেণি বিজ্ঞান নোট। part-1

উন্নততর জীবনধারা — Part-1: খাদ্য ও পুষ্টি
📚 প্রথম অধ্যায় · বিজ্ঞান · নবম-দশম শ্রেণি

উন্নততর জীবনধারা

Part-1: খাদ্য ও পুষ্টি — সম্পূর্ণ ইন্টারেক্টিভ ক্লাসনোট

🌾 খাদ্য ও পুষ্টি 🍚 শর্করা 🥩 আমিষ 🫒 স্নেহ পদার্থ 💊 ভিটামিন ⚖️ BMI 🥗 সুষম খাদ্য
১.১ খাদ্য ও পুষ্টি (Food and Nutrition)
🌱 পুষ্টি কী?

পুষ্তি হলো পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যবস্তু আহরণ করে তা পরিপাক ও শোষণ করা এবং আত্তীকরণ দ্বারা দেহের শক্তির চাহিদা পূরণ, রোগ প্রতিরোধ, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করা। পুষ্টির ইংরেজি শব্দ হলো Nutrition

খাদ্যের যেসব জৈব অথবা অজৈব উপাদান জীবের বেঁচে থাকার জন্য দরকারি শক্তির জোগান দেয়, তাদের একসঙ্গে পরিপোষক বা নিউট্রিয়েন্টস (Nutrients) বলে।

খাদ্যের প্রধান তিনটি কাজ:
  • খাদ্য দেহের গঠন, বৃদ্ধিসাধন, ক্ষয়পূরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
  • খাদ্য দেহে তাপ উৎপাদন করে, কর্মশক্তি প্রদান করে।
  • খাদ্য রোগ প্রতিরোধ করে, দেহকে সুস্থ, সবল এবং কর্মক্ষম রাখে।
🧱 খাদ্যের উপাদান (Food Components)

খাদ্যের উপাদান ছয়টি: শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানি। এছাড়াও খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আঁশ

খাদ্যের উপাদান মুখ্য উপাদান সহায়ক উপাদান শর্করা আমিষ স্নেহ পদার্থ ভিটামিন খনিজ লবণ পানি আঁশ

চিত্র: খাদ্যের উপাদান

১.১.১ শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrate)
শর্করা উৎস
শর্করা (Carbohydrate)
ধান, গম, আখ, আলু — প্রধান উৎস
শক্তির প্রধান উৎস ৪ kcal/g
শক্তি উৎপাদন
প্রতি গ্রামে ৪ কিলোক্যালরি শক্তি
🌾 শর্করার প্রকারভেদ ও উৎস
  • শ্বেতসার বা স্টার্চ: ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য শস্য দানা স্টার্চের প্রধান উৎস। এছাড়া আলু, রাঙা আলু বা কচুতেও পাওয়া যায়।
  • গ্লুকোজ: আঙুর, আপেল, গাজর, খেজুর ইত্যাদিতে পাওয়া যায়।
  • ফ্রুক্টোজ (Fruit Sugar): আম, পেঁপে, কলা, কমলালেবু প্রভৃতি মিষ্টি ফল এবং ফুলের মধুতে থাকে।
  • সুক্রোজ: আখের রস, চিনি, গুড়, মিছরির উৎস।
  • সেলুলোজ: বেল, আম, কলা, তরমুজ, বাদাম, শুকনো ফল এবং সব ধরনের শাকসবজিতে থাকে।
  • ল্যাকটোজ বা দুধ শর্করা: গরু, ছাগল এবং অন্যান্য প্রাণীর দুধে এই শর্করা থাকে।
  • গ্লাইকোজেন: পশু ও পাখিজাতীয় প্রাণীর যকৃৎ এবং মাংসে (পেশিতে) গ্লাইকোজেন শর্করাটি থাকে।
  • শর্করা শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং তাপশক্তি উৎপাদন করে।
  • জীবদেহে বিপাকীয় (Metabolic) কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি কার্বোহাইড্রেট জারণের ফলে উৎপন্ন হয়।
  • গ্লাইকোজেন প্রাণীদেহে খাদ্যঘাটতিতে বা অধিক পরিশ্রমের সময় শক্তি সরবরাহ করে।
  • সেলুলোজ একটি অপাচ্য প্রকৃতির শর্করা, এটি আঁশযুক্ত খাদ্য। এটি আমাদের দৈনন্দিন মল ত্যাগে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।
  • খাদ্যে প্রোটিন কিংবা ফ্যাটের অভাব হলে শর্করা থেকে এগুলো সংশ্লেষিত হতে পারে।
১.১.২ আমিষ বা প্রোটিন (Protein)
🥩 আমিষ বা প্রোটিন

প্রাণীদেহের গঠনে প্রোটিন অপরিহার্য। দেহকোষের বেশির ভাগই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। দেহের হাড়, পেশি, লোম, পাখির পালক, নখ, পশুর শিং — এগুলো সবই প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়। প্রাণীদেহের শুষ্ক ওজনের প্রায় ৫০% হচ্ছে প্রোটিন।

আমিষের প্রকারভেদ (উৎস অনুযায়ী):
  • প্রাণিজ আমিষ: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত পদার্থ — সম্পূর্ণ প্রোটিন (সব অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে)।
  • উদ্ভিজ্জ আমিষ: ডাল, সয়াবিন, মটরশুঁটি বীজ এবং ভুট্টার মধ্যে পুষ্টিমূল্য বেশি। তবে অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাদ্যে অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে না।
প্রাণিজ আমিষ উৎস
প্রাণিজ আমিষ
মাছ, মাংস, ডিম, দুধ
উদ্ভিজ্জ আমিষ উৎস
উদ্ভিজ্জ আমিষ
ডাল, সয়াবিন, মটরশুঁটি
১.১.৩ স্নেহ পদার্থ বা লিপিড (Lipid/Fat)
🫒 স্নেহ পদার্থ

ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লিসারলের সমন্বয়ে স্নেহ পদার্থ গঠিত হয়। আমাদের খাবারে প্রায় ২০ ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।

প্রকারভেদ বৈশিষ্ট্য উদাহরণ
কঠিন স্নেহ (চর্বি)সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিনমাছ বা মাংসের চর্বি
তরল স্নেহ (তেল)অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় তরলসয়াবিন, সরিষার তেল
প্রাণিজ স্নেহচর্বিসহ মাংস, মাখন, ঘি, পনির, ডিমের কুসুমমাখন, ঘি, পনির
উদ্ভিজ্জ স্নেহবিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিজ্জ তেলসরিষা, সয়াবিন, তিল, ভুট্টা, নারকেল
স্নেহ পদার্থের কাজ:
  • খাদ্যবস্তুর মধ্যে স্নেহ পদার্থ সবচেয়ে বেশি তাপ এবং অন্যান্য প্রকার শক্তি উৎপন্ন করে।
  • দেহের পুষ্টি এবং বৃদ্ধির জন্য স্নেহ পদার্থ অতি আবশ্যক।
  • স্নেহ পদার্থ দেহ থেকে তাপের অপচয় বন্ধ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
  • ত্বকের মসৃণতা এবং সজীবতা বজায় রাখে এবং চর্মরোগ প্রতিরোধ করে।
  • যেসব ভিটামিন (A, D, E এবং K) স্নেহজাতীয় পদার্থে দ্রবণীয়, সেগুলো শোষণে সাহায্য করে।
১.১.৪ খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন (Vitamin)
💊 ভিটামিনের শ্রেণিবিভাগ

ভিটামিন হচ্ছে জৈব প্রকৃতির যৌগিক পদার্থ। কেকটি ভিটামিন স্নেহজাতীয় পদার্থে দ্রবীভূত হয়, আবার কেকটি ভিটামিন পানিতে দ্রবীভূত হয়।

  • স্নেহে দ্রবণীয়: ভিটামিন A, D, E ও K
  • পানিতে দ্রবণীয়: ভিটামিন B কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন C
👁️ ভিটামিন A

উৎস: ডিম, গরুর দুধ, মাখন, ছানা, দই, ঘি, যকৃৎ ও বিভিন্ন তেলসমৃদ্ধ মাছ (বিশেষ করে কড মাছ)। উদ্ভিজ্জ উৎসে ক্যারোটিন সমৃদ্ধ শাক-সবজি: লালশাক, কচুশাক, পুঁইশাক, পাটশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক, পুদিনা পাতা, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, আম, পাকা পেঁপে, কাঁঠাল।

কাজ:
  • দেহের স্বাভাবিক গঠন এবং বর্ধন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার কাজ নিশ্চিত করে।
  • ত্বক, চোখের কর্নিয়া ইত্যাদিকে স্বাভাবিক ও সজীব রাখে।
  • হাড় এবং দাঁতের গঠন এবং দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখে।
  • দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
  • দেহে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
অভাবজনিত রোগ: রাতকানা, চোখের কর্নিয়ায় আলসার, জেরোফথালমিয়া, অন্ধত্ব।
☀️ ভিটামিন D

উৎস: একমাত্র প্রাণিজ উৎস থেকেই ভিটামিন D পাওয়া যায়। সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে মানুষের ত্বকে উপস্থিত কোলেস্টেরল থেকে ধাপে ধাপে লিভার ও কিডনির সহায়তায় সংশ্লেষিত হয়। ডিমের কুসুম, দুধ এবং মাখন ভিটামিন D-এর প্রধান উৎস।

কাজ: শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে, যা হাড় তৈরির কাজে লাগে।
অভাবজনিত রোগ: শিশুদের রিকেট রোগ। অতিরিক্ত গ্রহণে অধিক ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষিত হওয়ায় বৃক্ক, হৃৎপিণ্ড, ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমা হতে থাকে।
🌿 ভিটামিন E

উৎস: সব রকম উদ্ভিজ্জ ভোজ্য তেল, বিশেষ করে পাম তেল ভিটামিন E-এর ভালো উৎস। শস্যদানার তেল (Corn oil), তুলা বীজের তেল, সূর্যমুখী বীজের তেল, লেটুস পাতাতেও পাওয়া যায়।

কাজ: মানুষের শরীরে ভিটামিন E হলো এন্টি-অক্সিডেন্ট, যেটি ধমনিতে চর্বি জমা রোধ করে এবং সুস্থ ত্বক বজায় রাখে।

🧬 ভিটামিন B কমপ্লেক্স

পানিতে দ্রবণীয় ১২ প্রকার ভিটামিন B রয়েছে। দেহের বৃদ্ধি, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের কাজ, দেহকোষে বিপাকীয় কাজ, প্রজনন ইত্যাদি সম্পন্ন করার জন্য খাদ্যে ভিটামিন B কমপ্লেক্সের উপস্থিতি অতি আবশ্যক।

ভিটামিনউৎসঅভাবজনিত রোগ
থায়ামিন (B1)ঢেঁকিছাঁটা চাল, আটা, ডাল, তেলবীজ, বাদাম, যকৃৎ, টাটকা ফল ও সবজিবেরিবেরি রোগ, স্নায়ুর দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ
রাইবোফ্লাভিন (B2)যকৃৎ, দুধ, ডিম, সবুজ শাকসবজি, গাছের কচি ডগাঠোঁটের দুপাশে ফাটল, মুখে ও জিভে ঘা, ত্বক খসখসে
নিয়াসিন (B5)মাংস, যকৃৎ, আটা, ডাল, বাদাম, তেলবীজ, ছোলা, শাকসবজিপেলেগ্রা রোগ (ত্বকে প্রদাহ, ডায়রিয়া, স্মৃতিভ্রংশ)
পাইরিডক্সিন (B6)চাল, আটা, মাছ, মাংস, শাকসবজি, ছোলা, ছত্রাক, বৃক্ক, ডিমের কুসুমখাওয়ায় অরুচি, বমিভাব ও অ্যানিমিয়া
কোবালামিন (B12)যকৃৎ, দুধ, মাছ, মাংস, ডিম, পনির, বৃক্ক প্রভৃতিরক্তস্বল্পতা, স্নায়ুতন্ত্রের অবক্ষয়
🍋 ভিটামিন C (অ্যাসকরবিক এসিড)

উৎস: টাটকা শাকসবজি এবং টাটকা ফলে ভিটামিন C পাওয়া যায়। শাক-সবজির মধ্যে মুলাশাক, লেটুস পাতা, ধনে পাতা, পুদিনা পাতা, কাঁচা মরিচ, ফুলকপি, করলা ইত্যাদিতে ভিটামিন C আছে। ফলের মধ্যে আমলকী, লেবু, কমলালেবু, টেমেটো, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি ভিটামিন C-এর উৎস।

অভাবজনিত রোগ: স্কার্ভি (দাঁতের মাড়ি ফুলে যায় ও রক্তপাত হয়)।
খনিজ লবণ ও পানি (Minerals & Water)
💧 খনিজ লবণ ও পানির ভূমিকা
  • ক্যালসিয়াম: হাড় ও দাঁত গঠনে সহায়তা করে। উৎস: দুধ, ডিম, শাকসবজি।
  • আয়রন (লোহা): রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজন। উৎস: মাংস, কলিজা, শাক।
  • আয়োডিন: থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন তৈরিতে সহায়ক। উৎস: সামুদ্রিক মাছ, আয়োডিনযুক্ত লবণ।
  • ফসফরাস: হাড় ও দাঁত গঠনে কাজ করে। উৎস: মাছ, মাংস, ডিম।
  • সোডিয়াম: দেহের তরলের ভারসাম্য রক্ষা করে। উৎস: সাধারণ লবণ।
  • দেহের প্রায় ৬০-৭০% পানি দিয়ে গঠিত।
  • পানি দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
  • পরিপাক ক্রিয়ায় এবং খাদ্য উপাদান শোষণে সহায়তা করে।
  • বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থ মল, মূত্র ও ঘামের মাধ্যমে বের করে দেয়।
  • জয়েন্টগুলোতে লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে।
  • এটি পরিপাকে সহায়তা করে। রাফেজ পানি শোষণ করে এবং মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
  • শরীর থেকে অপাচ্য খাদ্য নিষ্কাশনে সাহায্য করে।
  • এটি শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করে।
  • বারবার ক্ষুধার প্রবণতা কমাতে এটি কাজ করে।
  • রাফেজযুক্ত খাদ্য গ্রহণে পিত্তথলির রোগ, খাদ্যনালি ও মলাশয়ের ক্যান্সার, অর্শ, হৃদরোগ ও স্থূলতার ঝুঁকি অনেকাংশে হাস করে।

প্রতিদিন ২০-৩০ গ্রাম আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

১.২ বডি মাস ইনডেক্স (BMI) বা দেহের ভরসূচি
⚖️ BMI কী এবং কীভাবে হিসাব করে

দেহের উচ্চতার সাথে ওজনের সামঞ্জস্য রক্ষা করার সূচককে বিএমআই (BMI: Body Mass Index) বা ভরসূচি বলা হয়। মানবদেহের বৃদ্ধি ২০-২৪ বছর পর্যন্ত ঘটে এবং তারপর আর উচ্চতার বৃদ্ধি হয় না।

BMI-এর সূত্র
দেহের ওজন (কেজি)
[দেহের উচ্চতা (মিটার)]²
BMI মানঅবস্থাব্যাখ্যা
< ১৮.৫কম ওজন (Underweight)পুষ্টির অভাব থাকতে পারে
১৮.৫ – ২৪.৯স্বাভাবিক (Normal)সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ
২৫ – ২৯.৯অতিরিক্ত ওজন (Overweight)সতর্কতা প্রয়োজন
≥ ৩০স্থূলকায় (Obese)বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেশি
১.৩ সুষম খাদ্য (Balanced Diet)
🥗 সুষম খাদ্য কী?

যে খাদ্যে সাতটি উপাদানই গুণাগুণ অনুসারে উপযুক্ত পরিমাণে থাকে এবং যে খাদ্য গ্রহণ করলে দেহে স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ ক্যালরি ও আঁশ পাওয়া যায়, তাকে সুষম খাদ্য (বা ব্যালান্সড ডায়েট) বলে।

দৈনিক সুষম খাদ্য
শর্করা — ৬০%
প্রোটিন — ২০%
স্নেহ (অসম্পৃক্ত) — ১৪%
স্নেহ (সম্পৃক্ত) — ৬%

চিত্র: একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক সুষম খাদ্যের বিভাজন

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক শক্তির প্রয়োজন:
  • সুস্থ কর্মশীল পুরুষ — প্রতিদিন প্রায় ২৫০০ কিলোক্যালরি
  • নারীর বেলায় — প্রতিদিন প্রায় ২০০০ কিলোক্যালরি
  • ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং রাফেজ বা আঁশের জন্য শাকসবজি ও ফল খাওয়া প্রয়োজন।
🍽️ সুষম খাদ্য যেভাবে প্রস্তুত করা হয়
শর্করাপ্রোটিনস্নেহজাতীয় পদার্থভিটামিনখনিজ লবণ
ভাতমাছমাখনদুধ, ডিমদুধ
রুটিমাংসতেলফলমূলডিম
চিনি/গুড়ডিমঘিমাছ, মাংসশাকসবজি
খাদ্য উপাদানের তুলনামূলক ছক
বৈশিষ্ট্য 🌾শর্করা 🥩আমিষ 🫒স্নেহ পদার্থ 💊ভিটামিন
মৌলিক উপাদানC, H, OC, H, O, N (S, P)C, H, Oজৈব যৌগ
প্রতি গ্রামে শক্তি৪ kcal৪ kcal৯ kcalশক্তি দেয় না
প্রধান কাজশক্তি উৎপাদনদেহ গঠন ও ক্ষয়পূরণশক্তি সঞ্চয়বিপাক নিয়ন্ত্রণ
দেহে সঞ্চিত হয়?হ্যাঁ (গ্লাইকোজেন)সীমিতহ্যাঁ (ফ্যাট সেলে)কিছুটা (স্নেহে দ্রবণীয়)
প্রধান উদ্ভিজ্জ উৎসচাল, গম, আলু, চিনিডাল, সয়াবিন, বাদামসরিষা, সয়াবিন তেলশাকসবজি, ফলমূল
প্রধান প্রাণিজ উৎসদুধ (ল্যাকটোজ), মাংস (গ্লাইকোজেন)মাছ, মাংস, ডিম, দুধমাখন, ঘি, চর্বিমাছ, মাংস, ডিম
অভাবজনিত সমস্যাক্লান্তি, দুর্বলতা, ওজন কমেকোয়াশিওরকর, মেরেসমাসদেহের ওজন কমে, ত্বক খসখসেবিভিন্ন নির্দিষ্ট রোগ
অতিরিক্ত গ্রহণে সমস্যাস্থূলতা, ডায়াবেটিসকিডনিতে চাপ পড়েহৃদরোগ, স্ট্রোক, স্থূলতাটক্সিসিটি (A, D)
দ্রাব্যতাপানিতে দ্রবণীয়পানিতে আংশিক দ্রবণীয়স্নেহে দ্রবণীয়স্নেহে/পানিতে উভয়ে
দেহের মোট ওজনের %প্রধান জ্বালানিশুষ্ক ওজনের ৫০%পরিবর্তনশীলঅতি সামান্য
পরিপাক পণ্যগ্লুকোজঅ্যামাইনো অ্যাসিডফ্যাটি অ্যাসিড + গ্লিসারলপরিপাক ছাড়াই শোষিত
১০
অভাবজনিত রোগসমূহ (Deficiency Diseases)
ভিটামিন A
রাতকানা / জেরোফথালমিয়া

রাতকানা হিসেবে দেখা দিলেও দীর্ঘস্থায়ী অভাবে চোখের কর্নিয়ায় আলসার হতে পারে এবং সম্পূর্ণ অন্ধত্ব হতে পারে। ত্বকের লোমকূপের গোড়ায় ছোট ছোট গুটির সৃষ্টি হতে পারে।

ভিটামিন D
রিকেট (শিশুদের)

শিশুদের রিকেট রোগ হতে পারে — হাড় নরম হয়ে যায়, পা বাঁকা হয়। অধিক গ্রহণে বৃক্ক, হৃৎপিণ্ড, ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমা হয়।

ভিটামিন B1
বেরিবেরি

দেহে থায়ামিনের চরম অভাবে বেরিবেরির লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর অভাবে স্নায়ুর দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি, খাওয়ায় অরুচি, ওজনহীনতা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।

ভিটামিন B2
ঠোঁট ফাটা / মুখে ঘা

রাইবোফ্লাভিনের অভাবে ঠোঁটের দুপাশে ফাটল দেখা দেয়, মুখে ও জিভে ঘা হয়, ত্বক খসখসে হয়।

ভিটামিন B5
পেলেগ্রা

নিয়াসিনের অভাবে পেলেগ্রা রোগ হয়। পেলেগ্রা রোগের প্রধান উপসর্গ হলো ত্বকে প্রদাহ, ডায়রিয়া এবং স্মৃতিভ্রংশ হওয়া।

ভিটামিন C
স্কার্ভি

অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়। দাঁতের মাড়ি ফুলে যায়, মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। ত্বকে রক্তক্ষরণ দেখা যায়।

প্রোটিন
কোয়াশিওরকর / মেরেসমাস

দেহকোষের বেশির ভাগই প্রোটিন দিয়ে তৈরি। প্রোটিনের অভাবে কোয়াশিওরকর (বয়স্কদের) ও মেরেসমাস (শিশুদের) রোগ হয়।

আয়রন
অ্যানিমিয়া (রক্তস্বল্পতা)

আয়রনের অভাবে হিমোগ্লোবিন কম হয়, ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এর লক্ষণ।

১১
গুরুত্বপূর্ণ রচনামূলক প্রশ্ন
সুষম খাদ্য কী? সুষম খাদ্যের উপাদানগুলো বর্ণনা করো এবং কেন সুষম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন তা ব্যাখ্যা করো।
পরীক্ষায় আসে ★ গুরুত্বপূর্ণ
সুষম খাদ্য: যে খাদ্যে সাতটি উপাদানই গুণাগুণ অনুসারে উপযুক্ত পরিমাণে থাকে এবং যে খাদ্য গ্রহণ করলে দেহে স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ ক্যালরি ও আঁশ পাওয়া যায়, তাকে সুষম খাদ্য বলে।

উপাদান:
  • শর্করা (প্রধান শক্তির উৎস)
  • আমিষ (দেহ গঠন ও ক্ষয়পূরণ)
  • স্নেহ পদার্থ (শক্তি সঞ্চয়)
  • ভিটামিন (বিপাক নিয়ন্ত্রণ)
  • খনিজ লবণ (দেহের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ)
  • পানি (দেহের তরল ভারসাম্য রক্ষা)
  • আঁশ (পরিপাকে সহায়তা)
প্রয়োজনীয়তা: সুষম খাদ্য শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখে। শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ, গর্ভবতী নারীদের জন্য অতিরিক্ত পুষ্টি এবং বয়স্কদের ক্ষয়পূরণের জন্য সুষম খাদ্য অপরিহার্য।
ভিটামিন A-এর উৎস, কাজ এবং অভাবজনিত রোগ বর্ণনা করো।
পরীক্ষায় আসে ★ গুরুত্বপূর্ণ
উৎস: প্রাণিজ — ডিম, গরুর দুধ, মাখন, ছানা, দই, ঘি, যকৃৎ, কড মাছ। উদ্ভিজ্জ — ক্যারোটিন সমৃদ্ধ শাক-সবজি: লালশাক, কচুশাক, পুঁইশাক, পাটশাক, কলমিশাক, ডাঁটাশাক, গাজর, মিষ্টি কুমড়া, আম, পাকা পেঁপে, কাঁঠাল।

কাজ:
  • দেহের স্বাভাবিক গঠন এবং বর্ধন নিশ্চিত করে।
  • ত্বক, চোখের কর্নিয়া ইত্যাদিকে স্বাভাবিক ও সজীব রাখে।
  • হাড় ও দাঁতের গঠন এবং দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখে।
  • দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
  • দেহে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
অভাবজনিত রোগ: শুরুতে রাতকানা হিসেবে দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী অভাবে চোখের কর্নিয়ায় আলসার ও জেরোফথালমিয়া হয়, এমনকি সম্পূর্ণ অন্ধত্বও হতে পারে। ত্বকের লোমকূপের গোড়ায় ছোট ছোট গুটির সৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন A গ্রহণও ক্ষতিকর।
BMI কী? BMI-এর সূত্র লেখো এবং BMI-এর মানের ভিত্তিতে মানুষের শারীরিক অবস্থা ব্যাখ্যা করো।
পরীক্ষায় আসে MCQ
BMI (Body Mass Index): দেহের উচ্চতার সাথে ওজনের সামঞ্জস্য রক্ষা করার সূচককে BMI বা ভরসূচি বলা হয়।

সূত্র: BMI = দেহের ওজন (কেজি) ÷ [দেহের উচ্চতা (মিটার)]²

BMI-এর মান অনুযায়ী শারীরিক অবস্থা:
  • BMI < ১৮.৫ → কম ওজন (Underweight)
  • BMI ১৮.৫ – ২৪.৯ → স্বাভাবিক (Normal)
  • BMI ২৫ – ২৯.৯ → অতিরিক্ত ওজন (Overweight)
  • BMI ≥ ৩০ → স্থূলকায় (Obese)
শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটের প্রকারভেদ বর্ণনা করো। শর্করার পুষ্টিগত গুরুত্ব কী?
পরীক্ষায় আসে ★ গুরুত্বপূর্ণ
শর্করার প্রকারভেদ:
  • উদ্ভিজ্জ উৎস: শ্বেতসার (স্টার্চ) — ধান, গম, ভুট্টা, আলু; গ্লুকোজ — আঙুর, আপেল, গাজর; ফ্রুক্টোজ — মিষ্টি ফল; সুক্রোজ — চিনি, গুড়; সেলুলোজ — শাকসবজি, ফলমূল।
  • প্রাণিজ উৎস: ল্যাকটোজ (দুধ শর্করা) — গরু ও ছাগলের দুধ; গ্লাইকোজেন — পশু ও পাখির যকৃৎ ও মাংস।
পুষ্টিগত গুরুত্ব:
  • শর্করা শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং তাপশক্তি উৎপাদন করে (প্রতি গ্রামে ৪ kcal)।
  • বিপাকীয় কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি কার্বোহাইড্রেট জারণের ফলে উৎপন্ন হয়।
  • গ্লাইকোজেন খাদ্যঘাটতি বা অধিক পরিশ্রমের সময় শক্তি সরবরাহ করে।
  • সেলুলোজ মল ত্যাগে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে।
স্নেহ পদার্থ কী? স্নেহ পদার্থের প্রকারভেদ ও কাজ বর্ণনা করো। স্নেহ পদার্থের অভাবে কী সমস্যা হয়?
পরীক্ষায় আসে ★ গুরুত্বপূর্ণ
স্নেহ পদার্থ: ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লিসারলের সমন্বয়ে স্নেহ পদার্থ গঠিত হয়। আমাদের খাবারে প্রায় ২০ ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।

প্রকারভেদ:
  • কঠিন স্নেহ (চর্বি): সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন। যেমন: মাছ বা মাংসের চর্বি।
  • তরল স্নেহ (তেল): অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণ তাপমাত্রায় তরল। যেমন: সয়াবিন, সরিষার তেল।
কাজ:
  • খাদ্যবস্তুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাপ এবং অন্যান্য প্রকার শক্তি উৎপন্ন করে (প্রতি গ্রামে ৯ kcal)।
  • দেহের পুষ্টি এবং বৃদ্ধির জন্য আবশ্যক।
  • ভবিষ্যতের জন্য খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
  • ত্বকের মসৃণতা ও সজীবতা বজায় রাখে এবং চর্মরোগ প্রতিরোধ করে।
অভাবে সমস্যা: দেহের ওজন কমে যায়, ত্বক শুষ্ক এবং খসখসে হয়ে সৌন্দর্য নষ্ট হয়। দীর্ঘদিন স্নেহ পদার্থের অভাব হলে শরীরের সঞ্চিত প্রোটিন ক্ষয় হয় এবং ওজন কমে যায়।
ভিটামিন B কমপ্লেক্সের গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনগুলোর উৎস, কাজ ও অভাবজনিত রোগ একটি ছকে দেখাও।
পরীক্ষায় আসে ★ গুরুত্বপূর্ণ
পানিতে দ্রবণীয় ১২ প্রকার ভিটামিন B রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনগুলো:
  • থায়ামিন (B1): উৎস — ঢেঁকিছাঁটা চাল, আটা, ডাল। অভাবে — বেরিবেরি, স্নায়ুর দুর্বলতা।
  • রাইবোফ্লাভিন (B2): উৎস — যকৃৎ, দুধ, ডিম, সবুজ শাকসবজি। অভাবে — ঠোঁটের দুপাশে ফাটল, মুখে ও জিভে ঘা।
  • নিয়াসিন (B5): উৎস — মাংস, যকৃৎ, আটা, ডাল। অভাবে — পেলেগ্রা (ত্বকে প্রদাহ, ডায়রিয়া, স্মৃতিভ্রংশ)।
  • পাইরিডক্সিন (B6): উৎস — চাল, আটা, মাছ, মাংস। অভাবে — অ্যানিমিয়া, বমিভাব।
  • কোবালামিন (B12): উৎস — যকৃৎ, দুধ, মাছ, মাংস। অভাবে — রক্তস্বল্পতা, স্নায়ুতন্ত্রের অবক্ষয়।
১২
MCQ কুইজ
🧠 MCQ কুইজ — উন্নততর জীবনধারা
প্রতিটি প্রশ্নে সঠিক উত্তর বেছে নাও। শেষে স্কোর দেখো।
খাদ্যের কোন উপাদান সবচেয়ে বেশি তাপশক্তি উৎপন্ন করে?
ভিটামিন D-এর অভাবে শিশুদের কোন রোগ হয়?
BMI-এর স্বাভাবিক মান কত?
ভিটামিন A-এর অভাবে কোন রোগ হয়?
কোনটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন?
প্রাণীদেহের শুষ্ক ওজনের কত শতাংশ প্রোটিন?
কোনটি ফ্রুকটোজের উৎস?
থায়ামিন (B1)-এর অভাবে কোন রোগ হয়?
একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ কর্মশীল পুরুষের দৈনিক শক্তির প্রয়োজন কত?
১০ কোন ভিটামিনের অভাবে পেলেগ্রা রোগ হয়?
১১ ভিটামিন C-এর সবচেয়ে ভালো উৎস কোনটি?
১২ প্রতিদিন কত গ্রাম আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করা উচিত?
১৩ কোনটি গ্লাইকোজেনের উৎস?
০/১৩
পরীক্ষা দাও, তারপর ফলাফল দেখো!

Post a Comment

0 Comments